শিশুকে বাঁচান বুলিং থেকে
রাইসা তামরীনের (১০ বছর) হঠাৎ করেই স্কুলের প্রতি প্রচণ্ড অনীহা সৃষ্টি হয়েছে। সে স্কুলে যেতে চায় না। কেন যেতে চায় না জানতে চাইলে তার মা-বাবাকে বলেছে, স্কুল তার ভালো লাগে না। অনুসন্ধান করে জানা গেল, তার স্কুলে যাওয়ার পথে অন্য একটি মেয়েকে কিছু ছেলে খারাপ কথা বলেছিল। তা দেখে সে ভয় পেয়েছে। পাশাপাশি স্কুলে ক্লাসমেটরা প্রায়ই তার ব্যাগ/বই সরিয়ে ফেলে, বান্ধবীদের কেউ কেউ তার সঙ্গে কথা বলে না, কিছু ছেলেমেয়ে একজোট হয়ে তাকে কটাক্ষ করে কথা বলে। এতে রাইসার খুব খারাপ লাগে, স্কুলে তার খুব অসহায় মনে হয়। ক্লাসে মনোযোগ দিতে পারে না। রাইসা বুলিংয়ের শিকার। ৩০ শতাংশ শিশু-কিশোর বয়সীরা কোনো না কোনোভাবে বুলিংয়ের শিকার হয়। বুলিং সম্পর্কে ভালো ধারণা না থাকলে মা-বাবার পক্ষে সন্তানকে সহযোগিতা করা সম্ভব হয় না। জেনে নিই বুলিং সম্পর্কে কিছু তথ্য।
যখন কোনো ব্যক্তি বা দল কোনো শিশুকে উত্ত্যক্ত করে, ভুক্তভোগী শিশুটির পক্ষে অসহায় অনুভব করা ছাড়া কিছুই করার থাকে না, তখন তাকে বুলিং বলে। বুলিংয়ের ক্ষেত্রে সব সময়ই কোনো না কোনো প্রত্যক্ষদর্শী থাকে। প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছে হাসির পাত্র হিসেবে উপস্থাপন করাই বুলিংয়ের অন্যতম উদ্দেশ্য। শিশুরা যখন শিক্ষক বা অভিভাবকের চোখের বাইরে থাকে, তখনই মূলত বুলিংয়ের শিকার বেশি হয়।
বুলিংয়ের ধরন
♦ শারীরিক বুলিং : ধাক্কা দেওয়া, মারা, ফেলে দেওয়া, খোঁচা দেওয়া ইত্যাদি।
♦ মৌখিক বুলিং : অপমান করা, খারাপ কথা বলা, কটাক্ষ করা, হুমকি দেওয়া, আক্রমণাত্মক ভাষায় কথা বলা, ভয় দেখানো, কোনো কথা অনুকরণ করে ভেংচি কাটা ইত্যাদি।
♦ আবেগীয় হুমকি : এটিকে সম্পর্কগত আগ্রাসনও বলা হয়। ভুক্তভোগী শিশুকে নিয়ন্ত্রণের জন্য তার সঙ্গে কথা না বলা বা মেশা বন্ধ করে দেওয়া, অন্য ক্লাসমেটদের মিশতে নিষেধ করা ইত্যাদি।
♦ জাতিগত বুলিং : বর্ণ, ধর্ম, আর্থ-সামাজিক অবস্থান ইত্যাদি নিয়েও বুলিং হয়ে যাকে।
♦ সেক্সুয়াল বুলিং : যৌনতামূলক কথা বলা, ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলা বা মেসেজ দেওয়া, অপ্রত্যাশিতভাবে স্পর্শ করা বা করার চেষ্টা করা, যৌনবিষয়ক হুমকি দেওয়া ইত্যাদি।
বুলিংয়ের প্রভাব
যে শিশু বুলিংয়ের শিকার হয় এবং যে বুলিং করে তারা উভয়ই আলাদা ধরনের ক্ষতির সম্মুখীন হয়। যে শিশু বুলিং করে সে সঠিকভাবে সম্পর্ক পরিচালনার দক্ষতা হারাতে পারে। ভবিষ্যৎ জীবনেও তার সম্পর্কগুলোতে সমস্যা হতে পারে। যে শিশু বুলিংয়ের শিকার হতে থাকে তার আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদাবোধ কমে যায়। এ ছাড়া সে বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তাসহ নানা ধরনের সাইকোলজিক্যাল ডিসঅর্ডারেও ভুগতে পারে। স্কুলে যেতে ও স্কুলের কার্যক্রম করতে অসুবিধায় পড়তে পারে, এমনকি স্কুল ত্যাগও করতে পারে। পড়াশোনায় মনোযোগহীনতাও দেখা দিতে পারে।
বুলিংয়ে শিকার হওয়ার কিছু লক্ষণ
♦ হঠাৎ করে শিশুটির আচরণে পরিবর্তন লক্ষ করলে
♦ ভাই-বোনদের সঙ্গে মারামারির প্রবণতা বাড়লে
♦ শরীরে কাটা বা আঁচড়ের চিহ্ন দেখলে
♦ স্কুলে যেতে অনীহা প্রকাশ করলে বা ভয় পেলে
♦ স্কুল থেকে আসার পর অত্যধিক ক্ষুধার্ত থাকলে (হয়তো তার খাবার অন্য কেউ খেয়ে নিয়েছে)
♦ পড়াশোনায় মনোযোগ কমে গেলে
♦ প্রায়ই অন্যমনস্ক, দুশ্চিন্তা বা বিষণ্নতায় থাকলে
♦ এই লক্ষণগুলোর অর্থই সে বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে তা নয়, বুলিং এগুলোর অন্যতম কারণ।
মা-বাবার কী করণীয়
আস্থার সম্পর্ক : মা-বাবার প্রথম করণীয় হলো সন্তানের সঙ্গে আস্থার সম্পর্ক তৈরি করা। যেন সে বাইরে যাই ঘটুক না কেন মা-বাবার সঙ্গে তা বলতে পারে। এটি করতে হলে শিশুটির সৎ স্বীকারোক্তির পর তাকে শাস্তি না দিয়ে সংশোধনের সুযোগ দিতে হবে। শিশুটি বুলিংয়ের শিকার হলে তার প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করতে হবে। বুলিং হলে যেন মা-বাবা ও শিক্ষককে জানায় তার পরামর্শ দিতে হবে শিশুটিকে।
বাসা বুলিংমুক্ত রাখুন : প্রতিটি শিশুর আচরণের মূল হলো বাসা। যে শিশু বুলিং করে সে কোনো না কোনো বাসারই সন্তান। তাই শিশুকে এমন একটি পারিবারিক পরিবেশ দিন, যেখানে বুলিং চর্চা হয় না। কোনো শিশু বুলিং করলে তাকে অন্যদের সামনে বকা বা শাস্তি দিলে সেটাও এক ধরনের বুলিং হয়ে যায়। এটি না করে তাকে বুলিংয়ের ক্ষতিকর দিকগুলো এবং যাকে বুলিং করা হয় তার মনের মধ্যে কী কষ্ট হয় বুঝিয়ে দিতে হয় এবং বুলিং করতে নিরুত্সাহিত করতে হয়।
বিনোদনের মাধ্যমের ওপর নজর রাখুন : শিশুর বিনোদনের মধ্যে ভয়ংকর ভিডিও গেমস, টিভি সিরিয়াল, সিনেমা, বন্দুক—এ ধরনের উপকরণ, যেগুলো আগ্রাসনকে সমস্যা সমাধানের উপায় হিসাবে চিহ্নিত করে, না দেওয়ার চেষ্টা করতে হবে। আবার এমন কোনো খেলনা দেওয়া যাবে না, যা ব্যবহার করে সে অন্যকে বুলিং করতে পারে।
বুলিং নিয়ে কথা বলুন : যদি মনে হয় যে শিশুটি বুলিংয়ের শিকার হচ্ছে, তাহলে শিশুটির সঙ্গে নিজের জীবনের কোনো বুলিং অভিজ্ঞতা থাকলে শেয়ার করতে পারেন। অনেক সময় শিশুরা বুলিংয়ের কথা বাড়িতে বলতে চায় না। তারা মনে করে মা-বাবা এটির ক্ষেত্রে কোনো সাহায্য করতে পারবে না; বরং আমাকেই দোষ দেবে। আবার অনেকে মনে করে বাড়িতে এগুলো বললে তাকে আরো বুলিং শুনতে হবে। নিজের কথা শেয়ার করলে শিশুও তার কথা শেয়ার করতে পারে। কিভাবে বুলিং মোকাবিলা করেছিলেন তাও শিশুর সঙ্গে শেয়ার করুন।
বন্ধু তৈরি করতে সাহায্য করুন : বুলিং থেকে বাঁচার সব চেয়ে ভালো উপায় বন্ধু তৈরি করা। সন্তানকে শেখান কিভাবে বন্ধু তৈরি করতে হয়। বন্ধুুরা পাশে থাকলে বুলিংয়ের পরিমাণ কমে যায় বা একেবারেই বুলিং বন্ধ হয়ে যায়।
বাচনিক ও অবাচনিক দক্ষতা : বুলিংকারীরা বুলিং করে ভুক্তভোগীর চেহারা ও আচরণে পরিবর্তন দেখতে চায়। যখন তা দেখতে পায় তখন তারা আরো উত্যক্ত হয়ে আরো বুলিং করে। যদি শিশু সার্বিকভাবে (মানসিক ও শারীরিক প্রকাশে) মৌখিক বুলিংকারীদের কথা অগ্রাহ্য করতে পারে, তাহলে বুলিংকারীরা নিরুত্সাহিত হয়ে বুলিং করা কমিয়ে বা বন্ধ করে দেবে। এ ছাড়া অন্যান্য বুলিংয়ের ক্ষেত্রে চোখমুখের অভিব্যক্তি কেমন হলে বুলিংকারীরা বুলিং করতে সাহস পাবে না বা নিরুত্সাহিত হবে, তা হাতে-কলমে শিখিয়ে দিতে হবে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে নানা কৌশল কাজে লাগে, তাই শিশুকে বিভিন্ন ধরনের বাচনিক (কথা) ও অবাচনিক দক্ষতা (মুখভঙ্গিসহ শারীরিক প্রকাশভঙ্গি) বৃদ্ধির জন্য অনুশীলন করাতে হবে।
REF: কালের কণ্ঠ
doc2p provides you quick and easy access to doctors, healthcare facilities, and informative health blog posts anytime, anywhere.